
বিশেষ প্রতিবেদকঃ
কলাপাড়ায় ক্রমশ: বাড়ছে সাংবাদিকের সংখ্যা। একই সাথে বাড়ছে সাংবাদিক সংগঠনের সংখ্যা। এসকল সাংবাদিকের শিক্ষাগত যোগ্যতা, সাংবাদিকতা বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষন নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। সাংবাদিকতার মহান পেশায় নিয়োজিত থেকে এরা সাধারন মানুষের কল্যানে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারছে, না সাংবাদিক পরিচয়ে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে সাংবাদিকতার মহান পেশাকে কলুষিত করছে- এমন প্রশ্ন এখন সচেতন মহলের। সাংবাদিকতার নীতিমালা, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও আইনের তোয়াক্কা না করে প্রায়শ:ই আদালতের তদন্তাধীন কিংবা বিচারাধীন মামলা নিয়ে এরা প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। এছাড়া নারী ও শিশু আইনে অনধিক দুই বছর কারাদন্ড বা অনূর্ধ এক লক্ষ টাকা অর্থদন্ড’র নির্দেশনা থাকার পরও আইনের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এরা দেদারছে ভিকটিম নারী ও শিশু’র পরিচয় প্রকাশ করছে। এতে সাংবাদিকতা পেশায় শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবী হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, কলাপাড়া উপজেলায় বর্তমানে প্রায় দেড়শ’ সাংবাদিক রয়েছে। এদের রয়েছে একাধিক ক্লাব, ইউনিটি, ফোরাম। এরা ঢাকা, বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, বরগুনা সহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জাতীয় ও স্থানীয় আঞ্চলিক দৈনিকের কার্ডধারী সাংবাদিক। কেউ কেউ আবার দেশের বিভিন্ন এলাকার অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ফেসবুক পেজ’র সাংবাদিক। টাকার বিনিময়ে পরিচয়পত্র সংগ্রহ এবং মাস শেষে পত্রিকার দাম পরিশোধ করে এদের কেউ কেউ এখন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাও বনে গেছেন। বিএনপি-জামায়াত-ফ্রিডম পার্টিতে সক্রিয় থাকা এদের কেউ কেউ গত দশ বছরে এসব সাংবাদিক সংগঠনে প্রবেশ করে। সাংবাদিকতা’র ইংরেজী শব্দ ’জার্নাালিজম’ ইংরেজীতে লিখতে না জানলেও স্থানীয় সরকার পরিষদের নির্বাচন সহ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এদের ভিড় দেখা যায় রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। ভোটের দিন মোটর সাইকেল নিয়ে ভোট কেন্দ্রে সাংবাদিক পরিচয়ে প্রত্যন্ত জনপদ দাপিয়ে বেড়াতে এরা নির্বাচন পর্যবেক্ষকের অনুমতি পেতে রীতিমত প্রতিযোগীতায় নামে। এসব সাংবাদিকরা নিজেরা সংবাদ লেখা ও প্রযুক্তি ব্যবহার না জানলেও তাদের পক্ষে কাজ করছে সাংবাদিক সংগঠনের বেশ ক’জন প্রভাবশালী সাংবাদিক। যারা এদের নামে কাট, কপি, পেষ্ট করে হুবহু দাড়ি, কমা, সেমিক্লোন সহ পাঠিয়ে দিচ্ছে একই সংবাদ। কারন সাংবাদিক সংগঠনগুলোতে এদের সদস্য পদ টিকিয়ে রাখতে হলে বাঁচিয়ে রাখতে হচ্ছে সাংবাদিক নামধারী এদের স্ব স্ব মিডিয়া গুলোকে। এরপর সাংবাদিক সংগঠনের সাইনবোর্ড ব্যবহার করে টু পাইস কামাতে এরা তোষামোদীতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে অফিস পাড়ায়, স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি সহ দূর্নীতিবাজ, ক্ষমতার অপব্যবহারকারী সরকারী কর্মকর্তা কিংবা রাজনৈতিক নেতার। কারন এসব নামধারী সাংবাদিকরা তাদের মিডিয়া হাউজ গুলো থেকে কোন ধরনের বেতন-ভাতা না পেলেও ভাব সাব নিয়ে চলছে এরা।
কেউ কেউ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের দাওয়াত না পেলেও ছুটে যান সেখানে অতিথি সাথে সেলফি তোলে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেন তারা।
এমন ভাব দেখায় যেন তিনি প্রধান অতিথি ওই খানে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাংবাদিক সংগঠনের এসকল সদস্যরা কেউ মোহরার, কেউ স্বল্প শিক্ষিত বেকার, কেউ ইট-বালু ব্যবসায়ী, কেউ নিউজ এজেন্সি মালিক, কেউ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী, কেউ মুদি দোকানী, কেউ প্যাথলজিষ্ট, কেউ হাতুড়ে ডাক্তার, কেউ দলিল লিখক, কেউ ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী। আবার কেউ কেউ বিএনপি-জামায়াত-ফ্রিডম পাটি থেকে এসে ওই সব দলের রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থেকে পিঠ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে এসব সাংবাদিক সংগঠনে।
প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি) সূত্র জানায়, ‘স্নাতক ডিগ্রি অর্থাৎ বিএ পাস ছাড়া নতুন কেউ সাংবাদিক হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারবেন না। যারা ইতোমধ্যে সাংবাদিকতায় ১২ বছর অতিবাহিত করেছে তাদের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিলযোগ্য হতে পারে।’
পিআইবি সূত্রটি আরও জানায়, ‘সাংবাদিকদের একটি তালিকা বা নিবন্ধনের আওতায় আনার ব্যাপারে কাজ চলছে। অপসাংবাদিকতা দূর করতে এটি সহায়ক হবে।’
প্রবীন সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুল্লাহ রানা আপন নিউজ’কে বলেন, ’আসলে এটি শুধু কলাপাড়ার বিষয় নয়। এটা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মহামারির মত। এটি শুধু সাংবাদিক অঙ্গনেই না, প্রশাসন থেকে শুরু করে সব সেক্টরে আজ এমন অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ নিয়ে আমরা শংকিত। এর প্রতিকার জরুরী হয়ে দাড়িয়েছে।’
Leave a Reply